হেফাজতের উদ্দেশ্য 'সৎ' নয়
Back to Top

ঢাকা, রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১১ আশ্বিন ১৪২৮

হেফাজতের উদ্দেশ্য 'সৎ' নয়

সাব্বাহ আলী খান কলিন্স ২:৫৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০২১

হেফাজতের উদ্দেশ্য 'সৎ' নয়
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি করোনা এবং হেফাজতে ঘুরপাক খাচ্ছে। কোন এজেন্ডা আগে আর কোনটা পরে নির্ধারণ করা খুবই জটিল। তবে হেফাজত ও করোনা দুটোই জলন্ত ইস্যু। দুটো এজেন্ডাই জনগণের জানমালের জন্য হুমকি স্বরূপ।

গত মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনকালে দেশের  ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে  হেফাজতের উগ্রতা, তাণ্ডব, অগ্নিসংযোগ, জ্বালাও-পোড়াও দেশবাসী প্রত্যক্ষ করলো।ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে ফেহাজত মেনে নিতে পারেনি তাই এই তাণ্ডব!

আসলেই কি এটাই মূল বক্তব্য? মোটেই না, হেফাজতের কর্মকাণ্ডের সাথে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার, আলবদরদের ৭১ এর অগ্নিসংযোগ তাণ্ডবকে স্মরণ করিয়ে দেয়- হেফাজতের এজেন্ডা এবং পাকবাহিনী, রাজাকার,আলবদর বাহিনীর এজেন্ডা এক ও অভিন্ন। শুধু সময়টা ভিন্ন। সেদিন ছিলো ৭১ আজ ২০২১ সাল।

১৯১৩ সালের ৫ মে হেফাজত ঢাকা অবরোধ করেছিলো, শাপলা চত্ত্বর জমায়েত বলে পরিচিত। সেদিন ওরা পরাজিত হয়েছিলো, ৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধেও হেফাজতের পূর্বসরিরা পরাজিত হয়েছিল। এই পরাজয় ওরা মেনে নিতে পারছে না আর তাই সুযোগ পেলেই পরাজয়ের গ্লানি মুছতে হেফাজত মারিয়া।

হেফাজতের নেতারা বলে থাকেন, হেফাজত রাজনৈতিক দল বা মোর্চা নয়, নির্জলা মিথ্যা। ইসলামে মিথ্যা বলা মহাপাপ। আর সেই পাপ দিয়েই ওদের যাত্রা শুরু। হেফাজত স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তির উত্তরাধিকার। এরা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, করে না গণতন্ত্র বিশ্বাস। নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস নেই, ওদের। ওদের ওস্তাদ শফি হুজুর বলেছিলেন, নারী হচ্ছে তেতুলের মতো, নারীর লেখাপড়া হবে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। মামুনুল হকের কাণ্ড তো দেখলাম, নিজের প্রয়োজনে নিজের মত ফতোয়া দেয়া এদের চরিত্র। এই দুশ্চরিত্র, কুরুচিপূর্ণ মানব সন্তান যদি হয় আলেম তবে জালেম দেখবো কিভাবে?

১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের শক্তিকে সরকারি দলের নীতি হয়তো হেফাজতকে  সাথে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলো, যে কারণে আমরা দেখলাম কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যবইয়ে হেফাজতের প্রস্তাব অনুসরণ করা হলো। কাওমি মাদ্রাসার শিক্ষাকে দেয়া হলো বিশেষ মর্যাদা। সরকারি দল বুঝল না তেল আর জল আসলে মিশে না। যা আজ প্রমাণিত। একমূখী শিক্ষার দাবি বহুকাল আগ হতে উচ্চারিত, আজ সেই দাবি প্রাসঙ্গিক হয়ে সামনে এসেছে। সাম্প্রদায়িক হেফাজত প্রধান দুই দলের শুভেচ্ছা ও সহানুভূতি নিয়ে ধীরে ধীরে আজ কেউটে সাপ থেকে অজগর এ রুপান্তরিত হয়েছে।এই অজগরকে রুখবে কে? নিশ্চয়ই অতীতের ন্যায় জনগণ।

বর্তমানে হেফাজত কিছুটা বিপদে আছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারণে।হেফাজতকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং এদের মুক্তির দাবি করেন। যা আবারো প্রমাণ করে বিএনপি হেফাজতের পাশে ১৩ সালের ৫ মে তে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন, বর্তমানে আছেন মহাসচিব।

 হেফাজত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলতে চেয়েছে। সম্প্রতি হেফাজতের তাণ্ডবের ভিডিও দেখলাম, তাদের এক কর্মী আঘাতের পর আঘাত করছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য-এ। কেনো এদের এতো আক্রোশ?  বুঝার জন্য অনেক বড় মনোবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না, যার ত্যাগ আর নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা, যে কারণেই সেখানে আঘাত করতে চায় ওরা ওদের মতো করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপোষের কোনো স্থান নাই। মামুনুল হকের গ্রেফতারের পর দেখলাম মিথ্যা রাজপথের লড়াইয়ের ভিডিও ওরা ছেড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, কতো বড় মিথ্যাচার! মুসলিম অধ্যাষিত এই দেশে রয়েছে লক্ষকোটি  কোমলমতি কিশোর ও তরুণ-যুবক। বেকারত্ব ও হতাশা থেকেও কিশোর, তরুণ-যুবক হেফাজতের আদর্শ গ্রহণ করলে, খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। এখনই হেফাজতের আদর্শ উদ্দেশ্য পরাস্ত করতে হবে।

সরকার দেরি করে হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এই 'জালেমদের' দোড়ানি দিয়েছে বা দিচ্ছে, গ্রেফতারও হচ্ছে। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে, এই আশা করা অবশ্যই সঠিক হবে না, তাই প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ সকল শক্তির একতা। সবাইকে এই একতাবদ্ধ করার দায়িত্বও আওয়ামী লীগের। এই দায় ইতিহাস তাকে দিয়েছে। হেফাজতিরা যতই বলুক বয়ান করুক যে তারা মহান আল্লাহর পথে আছে, আসলে তারা আছে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের পথে।

বঙ্গবন্ধুর দেয়া আমাদের ৭২ এর সংবিধান জেনারেল জিয়া এবং এরশাদ কেটে ছেটে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিজের স্বার্থে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে নিশ্চিত করেছে আর ক্ষতি হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। বঙ্গবন্ধুর মূল চার নীতি থেকে ছিটকে পড়লে বিপদের শেষ থাকবে না। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরেপক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রকে প্রতিনিয়ত আমাদের চর্চায় রাখতে হবে, তবেই যে হেফাজতি,পাকিস্তানি আর তালেবানিদের চ্যালেঞ্জ থেকে আমারা আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতি রক্ষা করতে পারবো।

হেফাজত যেভাবে মিথ্যা প্রচার করছে সেই প্রচারকেও আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। ধর্মব্যবসায়ীদের রুখতেই হবে,শান্তির ধর্ম ইসলাম রক্ষায়। জামায়াত, জঙ্গি গ্রুপ সব এখন হেফাজতের মোড়কে আবৃত। রাষ্ট্র ও সমাজের শান্তি রক্ষায় এদের রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করতে হবে, অন্যথায় ক্ষত রয়ে যাবে। যে ক্ষত ভবিষ্যতে আরো বড় দানব হয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে।ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবিকতা। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা রুখতে চাই, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকলের একতাবদ্ধ উদ্যোগ আর করোনায় আক্রান্তদের জন্য সুচিকিৎসা, বেকার যুবদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। করোনায় কর্মহারা বেকার, গরীব হয়ে যাওয়া  জনগোষ্ঠী ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রের এবং সামর্থ্যবানদের সাহায্যদানকারী  মানবিক উদার হস্ত খুব প্রয়োজন। উগ্র সাম্প্রদায়িক হেফাজত এবং করোনা মোকাবিলা এখন সময়ের প্রাসঙ্গিক কর্তব্য ও দায়িত্ব।

লেখক : সাব্বাহ আলী খান কলিন্স। সভাপতি, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী।

 

আরও পড়ুন

আরও