আর নিশীথে আসিবে না বন্ধু কালাচান
Back to Top

ঢাকা, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২০ | ১৮ চৈত্র ১৪২৬

আর নিশীথে আসিবে না বন্ধু কালাচান

মাসুম আওয়াল ১:০৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৭

আর নিশীথে আসিবে না বন্ধু কালাচান

কালের পরিক্রমায় আরেকটি বছর সমাগত। বিদায় নিতে চলেছে ২০১৭। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে যেমন চলছে তোড়জোড় তেমনি বিদায় বছরের প্রাপ্তির খাতায় যোগ বিয়োগের হিসাব-নিকেশ মিলিয়ে নিচ্ছেন সবাই।

প্রাপ্তির খাতায় যোগ বেশি হলেই চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক দেখা যায়। আর মূল্যবান কিছু বিয়োগ হলে বেদনায় ভরে যায় মন। তারা ভরা চোখে স্মৃতির পটে ভেসে উঠে সেই মুখটি। যাকে ভুলতে গিয়েও ভুলা যায় না। 

এ বছর আমাদের প্রাপ্তির খাতা থেকে খসে পড়েছে তেমনিই এক উজ্জল নত্রক্ষ, যার ভরাট কণ্ঠ আর বাঁশির সুরে মুগ্ধ হতেন সবাই। তিনি আর কেউ নন, গ্রামীণ ও আধ্যাত্মিক ধারার গানের এক অনন্য সম্পদ বারী সিদ্দিকী। 

কি হয়ে ছিল বারী সিদ্দিকীর?

চলতি বছরের ১৭ নভেম্বর রাত একটার দিকে বারী সিদ্দিকীর হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়। এ সময় অচেতন অবস্থায় প্রথমে তাকে রাজধানীর ঝিগাতলার ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে স্কয়ার হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক লাইফ সাপোর্ট দেন। 

সেখানে কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল ওয়াহাবের তত্ত্বাবধানে ছিলেন এই গুণী শিল্পী। অনেক দিন ধরেই চলছিল তার কিডনির সমস্যা। দুই বছর ধরে চলেছে তার ডায়ালাইসিস। সময় ফুরিয়ে গেলে চিকিৎসায় আর কী হয়? গত ২৪ নভেম্বর মারা যান প্রখ্যাত এই সংগীত শিল্পী। 

বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকীর গাওয়া ‘শুয়া চান পাখি’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘সাড়ে তিন হাত কবর’, ‘তুমি থাকো কারাগারে’, ‘রজনী’ প্রভৃতি গান এখনো চোখ ভিজিয়েই চলেছে সঙ্গীতপ্রেমীদের। 

বারী সিদ্দিকী কে?

১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলায় এক সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বারী সিদ্দিকী। শৈশবে পরিবারের কাছে গান শেখায় হাতেখড়ি তার। মাত্র ১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। 

তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ অসংখ্য গুণী শিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন। ওস্তাদ আমিনুর রহমান একটি কনসার্টের সময় বারী সিদ্দিকীকে অবলোকন করেন এবং তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। পরবর্তী ছয় বছর ধরে তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমানের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। 

বাশিঁওয়ালা হয়ে ওঠার গল্প

সত্তরের দশকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন বারী সিদ্দিকী। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ক্লাসিক্যাল মিউজিকের উপর পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বাঁশির ওপর উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। 

নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সঙ্গে ক্লাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন, একই সঙ্গে বাঁশির সুরেও মন মাতাতে থাকেন শ্রোতাদের। প্রথমত গানের চেয়ে বাঁশির যাদুতেই শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন বারী। বাঁশির সুর শুনিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান তিনি। 

হুমায়ূন আহমেদের সংস্পর্শ

দীর্ঘদিন সংগীতের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বারী সিদ্দিকী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর। এই ছবিতে তার গাওয়া ছয়টি গানই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর আরো অনেক গান গেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের। এগানগুলো তাকে পৌঁছে দিয়েছে জনপ্রিয়তার চূঁড়ায়। 

যা না বললেই নয়

বারী সিদ্দিকীর গাওয়া মৌলিক গানের সংখ্যা ১৬০টি। এর মধ্যে ৮০-৮৫টির গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়জী। এই গীতিকার ও সুরকার-শিল্পী জুটির খুব জনপ্রিয় হওয়া গানের মধ্যে রয়েছে- ‘ছোট্ট একটা মাটির ঘর, কেউ আসে না নিতে খবর’, ‘চন্দ্র সূর্য যত বড়, আমার দুঃখ তার সমান’, ‘আমার মন্দ স্বভাব জেনেও তুমি কেন চাইলে আমারে’, ‘এক মুঠো মাটির মালিকানা’ ও ‘আমি নাকি মন পোড়ানো কয়লার ব্যাপারী’ ইত্যাদি। এই শিল্পীর জীবনের একজন পরম বন্ধু ছিলেন গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়জী। 

বাউল বাড়ি ও শেষ নিদ্রা

নেত্রকোনা জেলা সদরের চল্লিশা বাজারের কার্লি গ্রামে বাউলবাড়িতে গত ২৪ নভেম্বর (শুক্রবার) বাদ মাগরিব জানাজা শেষে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বারী সিদ্দিকী। এ শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী সেখানে তাকে সমাহিত করা হয়। 

শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় প্রথম জানাজা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। দ্বিতীয় জানাজা হয় সকাল সাড়ে ১০টায় রামপুরার বাংলাদেশে টেলিভিশন ভবনে। বাদ আসর তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় নেত্রকোনা শহরের সাতপাই এলাকার সরকারি কলেজ মাঠে বিকেল সাড়ে চারটায়। বাউল বাড়িতে শেষ জানাজার পরে তাকে দাফন করা হয়। 

‘আর নিশীথে আসিবে না বন্ধু কালাচান’- নিজের গাওয়া এই গানটির মতই বারী সিদ্দিকী আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না আমাদের কাছে। কিন্তু, তার গাওয়া গান আর বাঁশির জাদুতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন সবার কাছে। 

এএ/এসবি/আইএম

 

বিশেষ আয়োজন: আরও পড়ুন

আরও