এমন বীভৎস মৃত্যু থামবে কবে
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮

এমন বীভৎস মৃত্যু থামবে কবে

বীরেন মুখার্জী ২:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২১

এমন বীভৎস মৃত্যু থামবে কবে
বিশ্বব্যাপী দাসপ্রথার নির্মমতার ইতিহাস কম-বেশি সকলেরই জানা। দাস জীবনের করুণগাথা এবং তাদের অসহায় করুণ মৃত্যুর খবরও অজানা নয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে দাস প্রথার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি হলেও, প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি। বিশ্বব্যাপী সভ্যতার উত্তরণ ঘটেছে, মানুষ নিজেকে সভ্য বলে দাবি করছে কিন্তু সভ্যতার নামে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়নি মানুষ। সমাপ্ত হয়নি তাদের ওপর নেমে আসা বর্বরতা ও অত্যাচারের কাহিনী।

ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বিশ্বায়নের যে ফাঁদ পেতেছে তাতে বদলে গেছে দাস প্রথার স্বরূপ। রূপান্তর ঘটেছে দাস প্রথায়। গত কয়েক বছরে দেশে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলে মনে করা যায়।
 
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের কেন্দ্রীয় গুদামে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে সম্প্রতি কয়লা হতে হলো অর্ধশতাধিক মানুষ। যাদের প্রায় কাউকেই আর শনাক্ত করার উপায় নেই। 

৮ জুলাই বিকাল ৫টায় ওই কারখানায় আগুন লাগার পর অগ্নিনির্বাপক দলের ১৮টি ইউনিট ২৯ ঘণ্টার জোর চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে যা হওয়ার সেটাই হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এটি কারখানা হিসেবে নয়, গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখানে দাহ্য রাসায়নিক দ্রব্যাদিও মজুদ ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। আর কেন্দ্রীয় এই গুদামের চারতলায় সজীব গ্রুপ নামে একটি কোম্পানি শিশু শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালাত। 

অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় কোনো শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডের সময় বের হতে পারেননি। ফলে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় কর্মরত মানুষ। অতীব দুঃখের সঙ্গেই বলতে হয়, দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই আমরা নিয়ম মেনে কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনায় ব্যস্ত থাকি। বৈদ্যুতিক মাধ্যমেও কথার লড়াই চলে। দেওয়া হয় নানান পরামর্শ। বাস্তবতা হলো এরপর নতুন কোনো ঘটনা সামনে এলে চাপা পড়ে যায় সব। এবারও যে এর ব্যত্যয় ঘটবে, তা হলফ করে বলা কঠিন।

আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মন্তুদ ইতিহাস। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ইতিহাসের ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১১৭ জন পোশাক শ্রমিকের কথা। কিংবা ২০১০ সালে রাজধানীর নিমতলীতে রাসায়নিক দোকান ও গুদামে আগুন লেগে পুড়ে মারা যাওয়া ১২৪ জন নারী-পুরুষের গল্প। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১১৩৬ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু এবং ২০১৯ সালে রাজধানীর চুড়িহাট্টায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ৭১ জন মানুষের করুণ মৃত্যুর কথা। তাজরীন ফ্যাশনে যখন আগুন লাগে তখন মিডিয়ার কল্যাণে আমরা দেখেছি জীবন বাঁচাতে ভবনটি থেকে অনেকে লাফিয়ে পড়েছেন। এতে অনেকে মারা যান। 

আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে শত শত শ্রমিকের বাঁচার আকুতি আর কান্না তখন নাড়া দিয়েছিল সারা বিশ্বকে। একইভাবে রানা প্লাজা ধসের ভয়াবহ ঘটনাও বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়া দেয়। বীভৎস ও নির্মম এসব দুর্ঘটনার স্মৃতি তো এত দ্রুত ঝাপসা হয়ে যাওয়ার কথা নয়! এসব বীভৎস মৃত্যু আর অসহায় মানুষের করুণ আর্তনাদ কি আমাদের বেদনার্ত করে না? হয়তো করে কিংবা করে না। কিন্তু দুর্ঘটনার দগদগে ক্ষত ভুক্তভোগী পরিবারকে যে এখনো বহন করতে হচ্ছে, তা সত্য। দুর্ঘটনায় বেঁচে থেকেও পঙ্গুত্বের বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে অনেককে।

অস্বীকারের সুযোগ নেই, এসব দুর্ঘটনা আমাদের নানান প্রশ্নে মুখোমুখি করে। একই সঙ্গে দেশের শিল্প-কারখানায় শ্রমিকের নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে বারংবার। বিদেশি পোশাক ক্রেতাদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বারবার চাপ দেওয়ার খবরও আমরা সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে জেনেছি। 

এসব দেখে-শুনে-বুঝে সংশ্লিষ্টদের নড়ে-চড়ে বসার কথা। কিন্তু তা কি হয়েছে সর্বৈব? তবে একেবারেই কিছু হয়নি তা বলা সমীচীন নয়। কিছুটা হয়েছে। কিন্তু আমরা কি প্রত্যাশিত সাফল্য পেয়েছি? কারখানায় শ্রমিকের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? বোধ করি হয়নি। আর হয়নি বলেই একের পর এক এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। 

নারায়ণগঞ্জের কারখানায় লাগা আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া মানুষের কথাও একদিন বিস্মরণে চলে যাবে। নতুন কোনো ঘটনা নিয়ে আবারো আহাজারি করতে হবে আমাদের। আর এ পরিস্থিতি কারো প্রত্যাশা হতে পারে না।

নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের পর সামনে এসেছে, ওই ভবনে যে রাসায়নিক গুদাম ছিল, তা ব্যবহারে লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। গণমাধ্যমে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক বলেছেন, ‘বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে এই প্রতিষ্ঠানকে কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি।’ 

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএসটিআই ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে শিল্প ভবনের অনুমোদন নেওয়া হলেও শর্ত মেনে এই কারখানা পরিচালনা করা হয়নি। দুর্ঘটনার পর কারখানাটির প্রাণে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, আগুন লাগা কারখানার চতুর্থতলা তালাবদ্ধ ছিল। কারখানার নিচের গেটও বন্ধ ছিল। যার কারণে শ্রমিকরা কারখানাটি থেকে বেরে হতে পারেননি। ভবনটির চতুর্থতলা থেকে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ৪৯টি লাশ উদ্ধার হওয়ায় শ্রমিকদের অভিযোগের সত্যতার বিষয়টিও সামনে আসে।

একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, দুর্ঘটনাকবলিত ভবনটি অপরিকল্পিতভাবে তৈরি। অনুমোদন নেই। যে কাজের জন্য অনুমোদন নেওয়া, তা না করে অন্য কাজ করা হতো। আমরা লক্ষ করি, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর এগুলোই সাধারণ অভিযোগ। প্রশ্ন হতে পারে, অভিযোগগুলো কর্তাব্যক্তিদের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানানো হয়।

সেগুলো কেন সঠিক সময়ে খতিয়ে দেখা হয় না? যদি অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কারখানা চালু রাখে বা আইন লঙ্ঘন করে, তাহলে কেন সময় থাকতে তা সংশোধনের জন্য আইন প্রয়োগ করা হয় না? এর জন্য তো সরকারের কলকারখানা পরিদর্শন বিভাগ রয়েছে। এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর, সংশ্লিষ্টরা কি দায় এড়াতে পারেন?

বলাই বাহুল্য, শ্রমের মূল্য সস্তা হওয়ায় আমাদের দেশে পর্যায়ক্রমে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে। যেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। কিন্তু আধুনিক দাসের জীবন বেছে নিতে বাধ্য মানুষগুলোর দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার কি কেউ নেই? আমরা শিল্পোন্নত দেশের দিকে যাচ্ছি। নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা থেকেও বেরিয়ে এসেছে আমাদের দেশ। আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এমন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্যে এ ধরনের দুর্ঘটনা কি সেই যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে না? বিষয়টি তলিয়ে দেখা কর্তব্য বলেই বিবেচনা করি। 

শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ কতটুকু আকৃষ্ট করা যাবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। খাঁচায় আটকা পড়া পশুর মতো মানুষের এই মৃত্যু আর কত? মানবিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, অধিকার শব্দগুলোর বাস্তবসম্মত প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি বলেই বিবেচনা করতে চাই। আমাদের দেশের সবখানেই এই যে দুর্নীতি, গাফিলতি; তারও সুরাহা হওয়া জরুরি। পাশাপাশি যে কোনো দুর্ঘটনায় শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা জরুরি, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া অবৈধ। শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। তাছাড়া তালা লাগিয়ে শ্রমিককে কাজের জায়গায় আটকে রাখাও মধ্যযুগীয় দাসপ্রথার মতো জঘন্য মানসিকতা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব মতে, বিশ্বের প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো জোরপূর্বক শ্রম, দাসত্ব ও দাসত্ব-সংশ্নিষ্ট প্রথার কাছে বন্দি। দাস প্রথার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পর এই তথ্য উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে। আমাদের দেশে এহেন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকার আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারে। 

দেশের সমৃদ্ধির জন্য কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা গেলে, বীভৎস মৃত্যু থামানো যেতে পারে বলে মনে করি।

লেখক: কবি, নির্মাতা ও গণমাধ্যমকর্মী

এইচআর
লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

আরও পড়ুন

আরও