আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

রাহমান মনি ৬:৩২ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৩, ২০২১

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
মফস্বল শহর মুন্সীগঞ্জে আমার শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ। প্রায়ই মুরব্বিদের কাছ থেকে পুরনো দিনের বিভিন্ন গল্প শুনে মনে বিভিন্ন প্রশ্নের উদ্রেক হতো। মনে হতো অধিকাংশই হয়তোবা রঙ মেশানো। তবে এটাও ভাবতাম যে অতীতকে মনে করে এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। হয়তো একদিন এই আজকের কোনো সুখস্মৃতি হয়ে উঠবে আমার ভবিষ্যতের নস্টালজিয়া!
বাংলাদেশের মানুষ চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক। রাজনৈতিক নানা ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশে কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক অ-সম্প্রীতির জন্ম হয়েছে। কিন্তু মোটের ওপর এই ভূমির সিংহভাগ মানুষ এখন পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক। ছেলেবেলা আমাদের সেইভাবেই কেটেছে। ছেলেবেলার ফুটবল, কাবাডি, ক্রিকেট, হকি, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, কুস্তি, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি ভোঁ ভোঁ-র মতো প্রচলিত খেলাগুলোর পাশাপাশি ‘টিলু এক্সপ্রেস’, ‘হ্যান্ডস আপ ফায়ার’ বা এই জাতীয় আঞ্চলিক খেলায়ও মেতে থাকতাম সকাল-সন্ধ্যা। শুধু মুন্সীগঞ্জ শহরই নয় পুরো বাংলাদেশের মধ্যে ক্রীড়া ক্ষেত্রে নামকরা একটি গ্রামের নাম মাঠপারা। মুন্সীগঞ্জ শহরের মধ্যে পাশাপাশি দুটি সবচেয়ে বড় মাঠকে (যা বর্তমানে জেলা স্টেডিয়ামে রূপ নিয়েছে) কেন্দ্র করে গ্রামটির নামকরণ বলে কথিত রয়েছে। এই মাঠপারাতেই আমার বেড়ে ওঠা।

মাঠপারাকে ঘিরে একটি ক্লাব গড়ে ওঠে। নাম তার ‘মাঠপারা সমাবেশ ক্লাব’। এক সময় দেশজুড়ে যার খ্যাতি ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে ফেরাই যার ঐতিহ্য ছিল। কারণ এই ক্লাবের সদস্য ছিলেন মোহামেডানের পক্ষ হয়ে ১৯৭৪ সালে ঢাকা লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা নওশের উজ্জামান, ঢাকা লীগের কোচ নজরুল ইসলাম, মোহামেডানের ক্যাপ্টেন স্বপনসহ অনেক নামিদামি ক্রীড়াবিদদের জন্মস্থান বা বসবাস এই মাঠপারায়। বর্তমানেও ক্লাবটির অবস্থান টিকে থাকলেও আগের ঐতিহ্য আর ধরে রাখতে পারছে না। তারপরও মাঠপারা সমাবেশ ক্লাব আমার প্রাণের সংগঠন।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থান। সত্তর দশকে তখন পৌরসভায় মাত্র ৩টি ওয়ার্ড ছিল। সেই ১ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার ছিলেন শ্রদ্ধেয় আনোয়ার হোসেন মোল্লা (আনু মোল্লা)। তবে, বিভিন্ন নামেই উনি এলাকায় পরিচিত ছিলেন। আনু মিয়া, আনু মোল্লা, আনু মেম্বার প্রমুখ তার মধ্যে অন্যতম। নিতান্ত সরল মনের মানুষটি প্রভাব প্রতিপত্তি, ভূসম্পত্তি, আর্থিক স্বচ্ছলতা, সুনাম সবদিক থেকেই সবার থেকে এগিয়ে থাকার পরও ছিলেন নিরহঙ্কারী ছিলেন। ছিলেন পরোপকারী।

গোয়ালভরা গরু, শানবাঁধানো ঘাট, গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ বলতে যা বোঝায় তার সবই ছিল আনু মিয়ার। মাঠপারার প্রাণকেন্দ্রে প্রাচীরঘেরা সবচেয়ে বড় বাড়ি (যদিও একই এলাকাতে তার একাধিক বাড়ি রয়েছে), সেই আমলে কাঠের দোতলা ঘর, রাইস মিলের মালিক হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন তিনি। তার বাড়িটি ছিল আমাদের কাছে অনেকটা খেলার মাঠের মতো। বিশেষ করে ‘টিলু এক্সপ্রেস’, ‘হ্যান্ডস আপ ফায়ার’ খেলার জন্য। দল বেঁধে আমরা খেলতাম। বাড়িটিতে চার ভিটিতে চারটি ঘর ছাড়া আরও একাদিক ঘর ছিল। ছিল গরুর গোয়াল ঘর।

ছয় ছেলে (হারেস ভাই, বাবুল ভাই, ইকবাল ভাই, আকবর ভাই, লিটন ভাই এবং মিল্টন) দুই মেয়ে (নাজমা আপা এবং তাহমিনা) কাজের লোক, গোমস্তা, আত্মীয়স্বজনের স্থায়ী নিবাস সব মিলিয়ে বিশাল সদস্যের পরিবার। এছাড়া খ-কালীন মেহমানদের আনাগোনা সর্বদা লেগেই থাকে। মেম্বার বাড়ি বলে কথা। আর প্রতিটি ঘরেই ছিল আমাদের খেলার অবাধ বিচরণ। ওই বয়সে খেলার সময় নির্দিষ্ট কোনো সময়জ্ঞান ছিল না। তাই, যখন তখন পালানোর ছলে যে কোনো ঘরে ঢুকে পড়তাম। শোবার ঘর, এমনকি দোতলায়ও।

মিল্টন ছিল আমার ক্লাসমেট। মুন্সীগঞ্জের কে. কে. স্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়েছি। এছাড়াও এলাকায় ভালো ছেলে হিসেবে একটা সুনামও ছিল। বাড়তি হিসেবে ছিল লিটন ভাইয়ের অপার স্নেহ। তবে, পারতপক্ষে বাবুল ভাইয়ের সামনে পড়তে চাইতাম না। তাকে একটু ভয় ভয় করত। যদিও কোনোদিন কিছুই বলেননি। দক্ষিণের ঘরটিতে তিনি সব সময় বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ইকবাল ভাই, আকবর ভাই আমাদের হৈহল্লাতে কোনোদিনই বিরক্তি প্রকাশ করেননি। দল বেঁধে সারা বাড়ি চষে বেড়াতাম খেলার জন্য। অনেক সময় খালাম্মা সবজি কাটছেন, রান্নায় ব্যস্ত, খাবার টেবিলে কেউ না কেউ আহার সারছেন আর এমন সময় আমাদের দৌড়াদৌড়িতে খালাম্মার কাজে বিঘ্ন ঘটছে অথচ খালাম্মা কোনো প্রকার বিরক্তি প্রকাশ করেননি বরং সময় সময় এটা সেটা দিতেন খাওয়ার জন্য।

মাঠের পশ্চিম পাশেই ছিল মাঠপারার একমাত্র হিন্দু বসতি, কালিপদ দাস (ঢাকা মোহামেডানের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন স্বপন দাসের বাবা) দাদার বাড়ি। স্বপন দাস এবং মুকুল দাসকে স্বপনদা, মুকুলদা বলে সম্বোধন করতাম। আর একমাত্র মেয়েকে কাজল দিদি। আবার তাদের বাবাকেও কালিপদদা বলে ডাকতাম। আমরা সবাই এইসঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতাম। কালিপদদাও আমাদের সঙ্গে খেলতেন এবং স্বপনদা আমাদের খেলা শেখাতেন।

আর এই কালিপদদার বাড়িটি ছিল খেলা শেষে কিংবা বিরতির সময় তৃষ্ণা মেটানোর জায়গা ও বিশ্রামাগার। কোনো সময় কালিপদদা নিজে, কখনো বা মুকুল আবার কখনো বা প্রাণকৃষ্ণ পানি এনে দিতেন। আর কেহ না থাকলে কাজল দিদি এনে দিতেন। মাঝে মধ্যে পানির সঙ্গে নাড়– বা অন্যান্য কিছুও আসত। মাঝে মাঝে খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে খেলতে হতো। আর ভাগ্য খারাপ হলে মাঠে বসে খেলা দেখেই আনন্দ পেতাম মন খারাপ হলেও। তবে, প্রতিদিন সবাই আসত না। কালিপদদার বাড়ির গেটের সামনের পেয়ারা গাছের পেয়ারাগুলো যে আমরাই খেতাম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কখনো বলে-কয়ে আর কখনো বা না বলে নিজেদের মনে করে। তবে, রান্নাঘরের টিনের চালে বল পড়লে একটু-আধটু রাগান্বিত যে হতেন না তা কিন্তু নয়। আবার অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে যখন পেয়ারা গাছে বলটি মারা হতো তখন বল এবং পেয়ারা দুটোই টিনের চালে পড়ত, কারণ গাছটি ছিল ঘরটির চালের ওপর।

কালিপদদার পাশের বাড়িটি ছিল বন্ধু কল্লোলদের বাসা। কল্লোলের আব্বা ছিলেন কাস্টম ইন্সপেক্টর। আমাদের ক্রীড়া সামগ্রীর জোগান কল্লোলদের বাসা থেকেই আসত। কল্লোলের বড় মিন্টু ভাই বয়সে বড় হলেও আমাদের সময় দিতেন। য়্যাবা, বনি অ্যাম, বব মার্লের গান তাদের বাসায় শোনা হতো। কল্লোল বাসায় না থাকলেও কোনো অসুবিধা হতো না। ভাগ্নে শ্যামল কিংবা রিনা আপা অথবা সাহানা আপা ক্রীড়া সরঞ্জাম (ফুটবল, ক্যারম বোর্ড, দাবা, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস কিংবা ক্রিকেট সরঞ্জাম) বের করে দিতেন। সেই ক্যারম বোর্ড নিয়ে কালিপদদার বাসার সামনে খালি জায়গাটাতে খেলতাম আর আবাহনী-মোহামেডান, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে মেতে থাকতাম। সে সময় স্থানীয় রাজনীতি আমাদের আলাপ-আলোচনা কিংবা আড্ডায় স্থান পেত না। আজ যেভাবে যেকোনো আড্ডা কিংবা খাবার টেবিলেও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা থেকে তর্ক-বিতর্ক থেকে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের ওই সময় রাজনৈতিক দল নিয়ে বিতর্ক ছিল না। বিতর্ক হতো আভ্যন্তরীণ এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন দল কিংবা খেলোয়াড় নিয়ে। তর্ক-বিতর্ক থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে, সব ভুলে পরক্ষণেই আবার একসঙ্গে সবাই আড্ডায় মেতে ওঠা, একসঙ্গে পথ চলা।

আরশেদ উদ্দিন চৌধুরী (মুন্সীগঞ্জ বার-এর প্রাক্তন সভাপতি, সিনিয়র আইনজীবী) ছিলেন আমাদের সংগঠক। আমরা তাকে ওস্তাদ বলে সম্বোধন করতাম। তার হাত-পা টেপা ছিল আমাদের খেলা শেখার পূর্ব শর্ত। আমরাও প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ছায়ায় পাটি পেতে শুয়ে থাকা ওস্তাদের পা টিপে দিতাম বিনা বাক্যব্যয়ে। খেলোয়াড় হওয়ার আশায়। বিষয়টি যে বুঝতে পারতাম না তা কিন্তু নয়। বুঝতাম, তবে মুরব্বিদের হুকুম তামিল করা ইবাদতের সামিল ভেবে সব কিছু করে যেতাম। মাঠপারার আনাচ-কানাচ সকাল-সন্ধ্যা চষে বেড়ানো ছিল আমাদের প্রতিদিনের কাজ। তাতে কোনো ক্লান্তিও আসত না এবং বাধাও পেতাম না। ব্যাপারটি এমন যে মাঠপারা প্রতিটি বাড়িই যেন আমাদের সবার। স্কুল ছুটি হতে দেরি হলেও আমাদের খেলার আয়োজন করতে দেরি হতো না। বাসায় গিয়ে বই রেখে ফিরে এসে খেলতে যাওয়া আমাদের কাছে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই, অনেক সময় বই দিয়েই গোল পোস্ট বানিয়ে কল্লোলদের বাসা থেকে বল এনে নিজেরাই খেলা শুরু করে দিতাম। খেলা শেষে মাঠ সংলগ্ন বড় পুকুরে দল বেঁধে সাঁতার কেটে এমনকি পানিতেও কিছুক্ষণ খেলা করে ভেজা কাপড়ে বাসায় গিয়ে মায়ের বকুনি ছিল প্রায় দিনের ঘটনা। সব ভুলে পরের দিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

অতীতের ভালো-মন্দ বর্তমানের জীবনে স্মৃতি হিসেবে ফিরে আসা এবং মনকে আর্দ্র করে দেওয়ার এই প্রবণতার পোশাকি নামই হলো ‘নস্টালজিয়া’। বিদেশি এই শব্দকে বাংলায় তর্জমা করলে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায়, হারিয়ে ফেলা দিনগুলোকে ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষা। কারণে-অকারণে নানা সময়ে মানুষ নস্টালজিয়ায় সময় কাটাতে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর এই নিদারুণ সময়ে নস্টালজিয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলার প্রবণতা বিশ্বজুড়েই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যেকোনো সংকটের সময়ে অতীতের সুখকর অনুভূতি স্মরণ করাও মানুষের জন্য বেশ স্বাভাবিক। অতীতকে মনে করে এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। হয়তো একদিন এই আজকের কোনো সুখস্মৃতি হয়ে উঠবে আপনার ভবিষ্যতের নস্টালজিয়া!

‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, আর এখন? বাউল সম্রাট শ্রদ্ধেয় শাহ আব্দুল করিমের প্রায় দেড় হাজার গানের মধ্যে একটি গানের প্রথম কলিই শুধু নয়। এখন বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পাহাড়সম একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে- আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম? অনেকেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখক: জাপান প্রবাসী

এইচআর
লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

আরও পড়ুন

আরও