সচেতনতার বিকল্প নেই
Back to Top

ঢাকা, সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫ আশ্বিন ১৪২৮

সচেতনতার বিকল্প নেই

ইমরান হুসাইন ২:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২১

সচেতনতার বিকল্প নেই
করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে সারা বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক দেশের মতো বাংলাদেশও মাশুল গুনছে। যার প্রভাবে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত। পাল্টে গেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের ধারা। করোনার প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে উঠতে না উঠিতেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ধাক্কা। কিন্তু এই দ্বিতীয় ধাক্কা এত ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যার প্রভাবে তৃতীয় ঢেউয়ের বড় শঙ্কায় বিশেষজ্ঞগণ।

ভয়াবহ এই অবস্থার কারণে সমাজের মানুষগুলো এখন আতঙ্কিত এবং হতাশ। করোনাভাইরাস তাণ্ডব প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন চলছে। করোনার প্রকোপ ১৫ মাস চলছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ সময় লকডাউনে কেটেছে। কিন্তু এতে লাভবান হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে নানা রকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পরিস্থিতি যখন একটু ভালো হয়েছে আমরা আবার বেপরোয়া হয়ে গেছি। পরিস্থিতি যখন আবার খারাপের দিকে যায় তখন একটু নড়েচড়ে বসি। ঠিক এভাবেই চলছে। এ যেন কানামাছি খেলা শুরু হয়েছে। সরকার লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ না দিলে আমরা কেউ মানি না, মানার চেষ্টাও করি না। যেন প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে চলছি আমরা। আমরা যতদিন না পর্যন্ত এই কানামাছি খেলা থেকে বের হতে না পারব ততদিন মুক্তি মিলবে না। ভয় যেন আমাদের করোনাতে নয়, ভয় প্রশাসন- পুলিশে! এমনটাই হয়ে উঠেছে। যার ফলে ক্রমেই অবস্থার অবনতি হচ্ছে।

আরেকটা বিষয় হলো দেশের সকল বিষয়াবলি সচল রেখে লকডাউন ঘোষণা। যেখানে স্বাভাবিকভাবে সব কিছুই চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত সব কিছুই সক্রিয় ও বেগবান। যেন করোনা শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে! করোনা প্রতিরোধে নামে মাত্র লকডাউন শব্দটা ব্যবহার করছি আমরা। যার বাস্তবে কোনো প্রয়োগ নেই। একের পর এক সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও না পালন হচ্ছে না। আমরা যদি সকলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ দিন সুষ্ঠু ও সুনিপুণভাবে সকল নিয়মকানুন মেনে লকডাউন মেনে চলি তবেই এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারি। এই মুহূর্তে সচেতনতাই একমাত্র সম্বল। কেন না টিকার কার্যক্রমে আমরা এখনও পরিপূর্ণ নিশ্চিত না যে টিকা দিলে আর করোনা হবে না বা এটাই একমাত্র রক্ষাকবচ। টিকা দেওয়ার পরেও অনেকের করোনা হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের টিকায়ও আছে স্বল্পতা। নিজেদের টিকা তৈরির সক্ষমতা না থাকায় বহির্বিশ্বের নিকট আমাদের চেয়ে থাকতে হয় বা আমদানি করতে হয়।

এই ৩০-৪৫ দিনের কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন করতে চাইলে, প্রথমেই ভাবতে হবে গরিব মানুষের বা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষদের কী হবে! হ্যাঁ, অবশ্যই তাদের কথা আগে ভাবতে হবে। তাদের ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। যেন তাদের কোনো প্রকার খাওয়ার কষ্ট না হয়। দীর্ঘমেয়াদি কঠোর লকডাউন ব্যতীত করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার শূন্যের কোটায় আনা সম্ভব না। করোনা সংক্রমণ রোধ করতে হলে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে হবে গরিব মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করে।

দেশের বর্তমান সময়ে করোনার এই ভয়াবহ রূপের কারণ আমরা নিজেরাই। নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা, অবহেলা, অসচেতনতা, অতিরিক্ত জনসমাগম আমরা করেই চলেছি। কোনোভাবেই আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। গণপরিবহন, ট্রেন, হাট-বাজারে, শপিংমলে সব জায়গাতেই জনসমাগম। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে দেশে যখন এপ্রিলের চার তারিখ থেকে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হলো তখন আমরা দেখেছি, গাদাগাদি করে লোকজন শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে রওনা দিয়েছে। সেখানে সম্পূর্ণ উপক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি। এরপর রোজার ঈদে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে বাড়ি ফেরে মানুষরা। আমরা দেখেছি যে ফেরিঘাট বন্ধ থাকাতে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের এমন ঘটনাও ঘটেছে, ফেরিতে যাত্রীদের চাপে তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে ও মানুষের ঢলে ৫-৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

যেখানে ষোল আনায় উপেক্ষিত ছিল স্বাস্থ্যবিধি এই মানুষরা আবার ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরেছে। এর পর থেকে করোনা সংক্রমণের হার বাড়তেই আছে। তার মানে তখনকার লকডাউন শব্দটার পরিপূর্ণ অর্থের বিচ্যুত ঘটেছে। এক মাস বাদে আবারও সামনে পবিত্র ঈদুল আযহা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মাঝে আবার কোরবানির পশুর হাট বসবে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে কোরবানির ঈদ ও পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা জানি যে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে তা না হলে একজনের কারণে বিপদে পড়ব ১০ জন। কিন্তু আমরা মানছি না অবহেলা করে। কোথাও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। মন্ত্রণালয় বা সরকার থেকে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে কিন্তু আমরা তা কানেই করছি না। ফলে সংক্রমণের হার বাড়তেই আছে। এই দায় একান্তই আমাদের। আমরা সবই দেখছি, বুঝতে পারছি, চোখের সামনে এত এত মানুষের মৃত্যুর খবর শুনছি তাতেই সচেতন হচ্ছি না।

আমরা যে সচেতন হচ্ছি না এবং দেশের এরূপ পরিস্থিতির জন্য আমরাই দায়ী। তার প্রমাণ দেয় আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনার প্রকোপ অতি হারে বৃদ্ধি পাওয়াতে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন সকল প্রকার যোগাযোগব্যবস্থা ও আমদানি রপ্তানি বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু বন্ধ করতে পারেনি সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে ওপারের মানুষের যোগাযোগ। প্রতিদিনই বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে চোরায় পথে যাওয়া আসা লোকদের আটক করছে। ওপারের সঙ্গে এভাবে অবাধে যোগাযোগ বাংলাদেশকে আরও হুমকির মুখে ফেলেছে।

মানুষের এমন অবাধা বিচরিণের প্রভাবে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের পাশাপাশি দেশে হানা দিয়েছে। নতুন আরেকটি ছত্রাকজনিত রোগ ‘ব্লাক ফাঙ্গাস’। অনেকের মাঝে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আমাদের দেশে খুব দ্রুত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করেছে এবং তা বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে জনসাধারণের মনে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকাতে করোনা শনাক্তের ৬৮ শতাংশ ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতেই হিমশিম অবস্থা। এখন চোখ রাঙাচ্ছে এই মারণ ভাইরাসের তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দেশের সীমান্ত এলাকাসহ নোয়াখালী ও মানিকগঞ্জ পর্যন্ত চলে এসেছে। অর্থাৎ এখন রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি।

চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অসাবধানতার সুযোগে তৃতীয় ঢেউয়ে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা আগের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হতে পারে। তাই এই পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতার পরামর্শ দেন তারা। এতদিন কোভিড-১৯ শনাক্ত ও মৃত্যু তুলনামূলক কম থাকায় ঢাকায় অনেকটাই স্বস্তি ছিল। তবে সেই স্বস্তি এখন আর থাকছে না।

করোনা সংক্রমণের এই বাড়া-কমা চিত্র আমাদের বলে দেয়, আমাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অসচেতনতার কারণেই আমরা দিনদিন আরও খারাপ অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি। সম্পূর্ণ প্রতিষেধকহীন এই মহামারীকে পরাজিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা। স্ব স্ব ব্যক্তিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সচেতন করতে হবে আশপাশের মানুষদের।

করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে যদি কঠোর লকডাউনের পন্থা গ্রহণ করা হয় তাহলে যেন আগে থেকে গরিব মানুষের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়। লকডাউন ঘোষণা করলে অবশ্যই তার বাস্তবায়ন করতে হবে। আংশিক লকডাউন বা ঢিলেঢালা লকডাউন বা সকালে বন্ধ বিকালে খোলা এমন পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়। কিছু না হোক নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখতে হলেও আসুন সচেতন হই। সুস্থ থাকি। করোনার এই ভয়াল রূপ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

আরও পড়ুন

আরও